রবুবিয়ত নিয়ে আলাপ ২
যদি আগের আলাপে রবুবিয়তকে সৃষ্টির প্রতি পালনের সম্পর্ক হিসেবে বুঝে থাকি, তাহলে এবার প্রশ্নটা রাজনীতির দিকে ঘুরে আসে। কারণ রাজনীতিও শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল নয়, শুধু দল, মতাদর্শ, নির্বাচন বা আন্দোলনের প্রশ্ন নয়। রাজনীতির গভীর প্রশ্ন হলো: কোন ব্যবস্থা জীবনকে পালন করছে, আর কোন ব্যবস্থা জীবনকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে? রবুবিয়তের আলোকে
যদি আগের আলাপে রবুবিয়তকে সৃষ্টির প্রতি পালনের সম্পর্ক হিসেবে বুঝে থাকি, তাহলে এবার প্রশ্নটা রাজনীতির দিকে ঘুরে আসে। কারণ রাজনীতিও শেষ পর্যন্ত শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল নয়, শুধু দল, মতাদর্শ, নির্বাচন বা আন্দোলনের প্রশ্ন নয়। রাজনীতির গভীর প্রশ্ন হলো: কোন ব্যবস্থা জীবনকে পালন করছে, আর কোন ব্যবস্থা জীবনকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে? রবুবিয়তের আলোকে রাজনীতি মানে শুধু কে শাসন করবে—এই প্রশ্ন না। বরং রাজনীতি মানে: মানুষ কীভাবে বাঁচবে, ভয় ছাড়া কথা বলবে, মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াবে, রিজিক পাবে, ঘর পাবে, স্মৃতি ধরে রাখবে, ভাঙা সম্পর্ক মেরামত করবে, এবং ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারবে। রাজনীতি তখন শুধু power-এর প্রশ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে amanah-এর প্রশ্ন। আমাদের হাতে যে মানুষ, মাটি, পানি, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান, স্মৃতি, শহর, গ্রাম, ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া হয়েছে—আমরা কি তা পালন করছি, নাকি ব্যবহার করছি? বাংলাদেশের জুলাই ২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ আমরা দেখেছি, মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান, বঞ্চনা, ভয়, অসম্মান এবং অশ্রুত কণ্ঠ একসময় বিস্ফোরিত হয়। কিন্তু বিস্ফোরণের পরও প্রশ্ন শেষ হয় না। বরং তখনই আসল প্রশ্ন শুরু হয়: এরপর কী? শুধু পুরনো শাসকের পতন কি যথেষ্ট? শুধু নতুন স্লোগান কি যথেষ্ট? শুধু নতুন মুখ, নতুন দল, নতুন জোট, নতুন ভাষা কি যথেষ্ট? নাকি আমাদের আরও গভীরে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে—কী ধরনের রাজনীতি মানুষকে আবার সত্য বলার সাহস দেবে? কী ধরনের রাজনীতি ক্ষমতাকে আমানত হিসেবে বুঝবে? কী ধরনের রাজনীতি দমন করা আকাঙ্ক্ষাকে আবার উচ্চারণযোগ্য করে তুলবে? এই জায়গা থেকে বাম-ডান রাজনীতির প্রচলিত ভাষা যথেষ্ট মনে হয় না। বাম ও ডান—দুই ধারারই নিজস্ব ইতিহাস, সত্য, সংগ্রাম ও সীমাবদ্ধতা আছে। বাম অনেক সময় সাম্য, শোষণ, অধিকার, শ্রেণি, মুক্তি ও ন্যায়বিচারের ভাষা দেয়। ডান অনেক সময় পরিবার, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, ধর্ম, জাতি, সামাজিক স্থিতি ও নৈতিকতার ভাষা দেয়। এসব ভাষা অপ্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু এগুলোই রাজনীতির শেষ ভাষা নয়।
কারণ রবুবিয়তের আলোকে প্রশ্নটি অন্য জায়গায় সরে যায়। কোনো অবস্থান বাম না ডান—তা শেষ প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো: এই অবস্থান কি জীবনকে পালন করছে? নাকি জীবনকে কোনো বিমূর্ত মতাদর্শ, বাজার, রাষ্ট্র, জাতি, শ্রেণি, ধর্ম, বিপ্লব, শৃঙ্খলা বা উন্নয়নের নামে ক্ষয় করছে? চরম বাম ও চরম ডান অনেক সময় তাদের ঘোষিত পার্থক্যের পরেও একধরনের মিলিত কাঠামো তৈরি করে। তাদের ভাষা আলাদা, শত্রু আলাদা, ইতিহাস আলাদা, কিন্তু ভেতরের ভঙ্গি অনেক সময় একরকম হয়ে যায়। উভয়ের ভেতরেই দেখা যেতে পারে পবিত্রতার রাজনীতি, শত্রু বানানোর প্রবণতা, জটিলতাকে সন্দেহ করা, ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতা ভাবা, এবং জীবনের বহুত্বকে একটি মাত্র ব্যাখ্যার ভেতর বন্দি করার চেষ্টা। একদিকে জাতি, ধর্ম, পরিবার, ঐতিহ্য বা শৃঙ্খলার নামে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। অন্যদিকে শ্রেণি, বিপ্লব, মুক্তি, জনগণ বা ন্যায়ের নামে মানুষকে আরেক ধরনের শৃঙ্খলায় বন্দি করা হতে পারে। একপক্ষ বলে, “তুমি জাতির শত্রু।” আরেকপক্ষ বলে, “তুমি বিপ্লবের শত্রু।” একপক্ষ বলে, “তুমি ধর্মের বিরুদ্ধে।” আরেকপক্ষ বলে, “তুমি ইতিহাসের ভুল দিকে।” ভাষা আলাদা, কিন্তু অতিরিক্ত নিশ্চয়তার বিপদ একই। রবুবিয়ত এই অতিরিক্ত নিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বিনয়ের রাজনীতি শেখায়। কারণ মানুষ চূড়ান্ত মালিক নয়, চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকারীও নয়। মানুষ trustee, khalifa, witness—সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে দাঁড়ানো এক দায়বদ্ধ সত্তা। এই অবস্থান বিনয় দাবি করে। মানুষের জ্ঞান সীমিত, পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, এবং নিজের নৈতিক অবস্থানও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে যে রাজনীতি নিজের অবস্থানকে একমাত্র সত্য বানিয়ে ফেলে, সে শেষ পর্যন্ত পালন করতে পারে না; সে শাসন করে, দমন করে, অথবা উদ্ধার করার নামে নতুন ক্ষত তৈরি করে। এই কারণেই রবুবিয়ত কোনো সেন্ট্রিজম নয়। এটি বাম ও ডানের মাঝখানে বসে থাকা কোনো মোলায়েম সমঝোতা নয়। সেন্ট্রিজম অনেক সময় শুধু সংঘাত এড়িয়ে চলার ভাষা, status quo-কে একটু নরম করে চালিয়ে যাওয়ার কৌশল। কিন্তু রবুবিয়ত সংঘাত এড়ায় না; বরং সংঘাতকে অন্য নৈতিক মাটিতে দাঁড় করায়। এটি বলে না, বাম থেকে একটু সাম্য আর ডান থেকে একটু শৃঙ্খলা নিয়ে একটি ভারসাম্য বানানো যাক। বরং রবুবিয়ত জিজ্ঞেস করে: সাম্য কাকে পালন করছে? শৃঙ্খলা কাকে দমাচ্ছে? স্বাধীনতা কার জন্য? ঐতিহ্য কাকে আশ্রয় দিচ্ছে, আর কাকে চুপ করাচ্ছে? উন্নয়ন কী সারাচ্ছে, আর কী ভাঙছে?
এখানে সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তন হলো: রবুবিয়ত রাজনীতিকে ideology থেকে cultivation-এর দিকে সরিয়ে নেয়। মতাদর্শ সাধারণত পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে চায়। পালন পৃথিবীকে ধরে রাখতে চায়। মতাদর্শ শত্রু খোঁজে। পালন সম্পর্ক মেরামত করে। মতাদর্শ প্রায়ই মানুষকে শ্রেণি, জাতি, নাগরিক, ভোটার, beneficiary, criminal, activist, student, migrant, minority, majority—এসব নামে ডাকে। পালন মানুষকে ভঙ্গুর, মর্যাদাসম্পন্ন, সম্পর্কনির্ভর, সম্ভাবনাময় সত্তা হিসেবে দেখে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রও চূড়ান্ত নয়, বাজারও চূড়ান্ত নয়, দলও চূড়ান্ত নয়, আন্দোলনও চূড়ান্ত নয়, কমিউনিটিও চূড়ান্ত নয়। রাষ্ট্র দরকার হতে পারে, যদি তা দুর্বলকে রক্ষা করে, অন্যায় থামায়, এবং পালনের অবকাঠামো তৈরি করে। কিন্তু রাষ্ট্র বিপজ্জনক হয়ে যায় যখন মানুষকে ফাইল, অনুমতি, নজরদারি, মামলা, ভয়, উচ্ছেদ, বা policy category-তে নামিয়ে আনে। বাজার দরকার হতে পারে, যদি তা জীবিকা, সৃজনশীলতা ও বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করে। কিন্তু বাজার ধ্বংসাত্মক হয়ে যায় যখন সব সম্পর্ককে দামে, মুনাফায় ও প্রতিযোগিতায় অনুবাদ করে। আন্দোলন দরকার হতে পারে, যদি তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করায়। কিন্তু আন্দোলনও বিপজ্জনক হতে পারে, যদি তা নিজের ভাষাকে একমাত্র সত্য বানিয়ে ফেলে। রবুবিয়ত তাই কোনো এক প্রতিষ্ঠানকে পবিত্র করে না। বরং সব প্রতিষ্ঠানকে আমানতের প্রশ্নে দাঁড় করায়। রাষ্ট্র কি আমানত রক্ষা করছে? বাজার কি আমানত নষ্ট করছে? পরিবার কি আশ্রয় দিচ্ছে, নাকি নিয়ন্ত্রণ করছে? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কি মানুষকে পালনের নৈতিকতা শেখাচ্ছে, নাকি শুধু আনুগত্য চাইছে? বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যের জায়গা খুলছে, নাকি ক্যারিয়ার, সার্টিফিকেট ও অবস্থান রক্ষার যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে? মিডিয়া কি সত্যকে ধারণ করছে, নাকি উত্তেজনা বিক্রি করছে? রাজনীতি কি মানুষকে মর্যাদা দিচ্ছে, নাকি শুধু ব্যবহার করছে? বাংলাদেশে এই প্রশ্নগুলো নতুন না, কিন্তু জুলাই ২৪-এর পর এগুলো আরও উন্মুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনীতি কিছু শক্ত বাইনারির মধ্যে আটকে ছিল: শাসক বনাম বিরোধী, সেক্যুলার বনাম ইসলামপন্থী, মুক্তিযুদ্ধ বনাম ধর্ম, উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা বনাম স্বাধীনতা, রাষ্ট্র বনাম জনগণ, প্রগতিশীল বনাম প্রতিক্রিয়াশীল। এগুলোর ইতিহাস আছে, গুরুত্ব আছে। কিন্তু এগুলো দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেক সময় এই বাইনারিগুলো মানুষকে সত্যি কথা বলতে দেয় না। সবাইকে আগে নিজের ক্যাম্প প্রমাণ করতে হয়, তারপর কথা বলতে হয়। রবুবিয়ত এই ক্যাম্প-প্রমাণের রাজনীতি থেকে বের হতে সাহায্য করে। এটি বলে: আগে বলো, তুমি কী পালন করছ? তুমি কি মানুষের মর্যাদা পালন করছ? তুমি কি সত্যের পরিবেশ পালন করছ? তুমি কি ভিন্নমতের নিরাপত্তা পালন করছ? তুমি কি দুর্বল মানুষের রিজিক, ঘর, শরীর, স্মৃতি, ভবিষ্যৎ—এসবের দায় নিচ্ছ? তুমি কি প্রকৃতি, নদী, মাটি, শহর, গ্রাম, শ্রম, জ্ঞান—এসবকে আমানত হিসেবে দেখছ? এইখানে পোস্টকলোনিয়াল অভিজ্ঞতা খুব জরুরি। ঔপনিবেশিকতা শুধু সম্পদ নেয়নি; মানুষের নিজের চাওয়া, ভয়, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ কল্পনার ভাষাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মানুষ শিখেছে ক্ষমতার সামনে কীভাবে কথা বলতে হয়। সরাসরি সত্য না বলে, গ্রহণযোগ্য সত্য বলতে হয়। পরে এই অভ্যাস চলেছে আমলাতন্ত্রে, উন্নয়ন প্রকল্পে, দাতা ভাষায়, কর্পোরেট সংস্কৃতিতে, পার্টি রাজনীতিতে, এমনকি নাগরিক সমাজের ভেতরেও। সবাই কথা বলে, কিন্তু সবাই সত্য বলে না। কারণ সত্য বলার সমান নিরাপত্তা সবার নেই। রবুবিয়তের আলোকে এই অসততা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক দুর্বলতা নয়; এটি দমনমূলক ব্যবস্থার লক্ষণ। মানুষ মিথ্যা বলে কারণ সে খারাপ—এভাবে দেখলে ভুল হবে। মানুষ অনেক সময় মিথ্যা বলে কারণ সত্য বলার পরিবেশ নেই। ছাত্র জানে, কোন কথা বললে বিপদ। শিক্ষক জানে, কতটুকু বলা নিরাপদ। কর্মচারী জানে, কার সামনে কী বলতে হয়। এনজিও জানে, কোন শব্দে ফান্ড আসে। কর্মকর্তা জানে, কোন ভাষায় কর্তৃত্ব টিকে থাকে। সাধারণ মানুষ জানে, কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। ফলে অংশগ্রহণ থাকে, কিন্তু সত্য থাকে না। আলোচনা থাকে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা থাকে না। মতামত থাকে, কিন্তু নিরাপত্তা থাকে না। মানুষ নিজের মনের কথা না বলে, অনুমোদিত ভাষা বলে। এভাবে একটি সমাজ ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছা দমন করতে শিখে। সে জানে কী বলা যায়, কী বলা যায় না। সে জানে কোন দাবি “যুক্তিসঙ্গত”, কোন দাবি “অতিরিক্ত”, কোন রাগ “অশোভন”, কোন বেদনা “রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক”।
এই দমন করা ইচ্ছার প্রশ্নটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে আনা দরকার। কারণ একটি সমাজ তখনই অসুস্থ হয়ে ওঠে, যখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষাকেও সন্দেহ করতে শেখে। যখন গরিব মানুষ নিজের অধিকারের ভাষা বলতে ভয় পায়। যখন মধ্যবিত্ত মানুষ নিরাপত্তার বিনিময়ে নীরবতা মেনে নেয়। যখন তরুণ প্রজন্ম সত্য বলতে চায়, কিন্তু প্রতিটি কথার আগে ভাবে—এতে আমি কোন ক্যাম্পে পড়ে যাব? যখন ধর্মীয় মানুষ ভাবে, তার ঈমানের ভাষা বললে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলা হবে। যখন সেক্যুলার মানুষ ভাবে, তার স্বাধীনতার ভাষা বললে তাকে ধর্মবিদ্বেষী বলা হবে। যখন সবাই নিজের ভাষা হারিয়ে অন্যের লেবেলের ভয়ে কথা বলে। রবুবিয়ত এই দমন করা ইচ্ছাগুলোকে গুরুত্ব দেয়। কারণ পালন মানে শুধু খাবার দেওয়া নয়; পালন মানে মানুষকে সত্য বলার পরিবেশ দেওয়া। পালন মানে এমন সমাজ তৈরি করা যেখানে মানুষ ভয় ছাড়া বলতে পারে—আমি কী চাই, আমি কী হারিয়েছি, আমি কীভাবে বাঁচতে চাই, আমার মর্যাদা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে রাজনীতি মানুষের ইচ্ছাকে ভয় পায়, সে পালনের রাজনীতি হতে পারে না। এই জায়গায় জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশকে শুধু রাষ্ট্রবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটিকে দেখতে হবে একটি গভীর নৈতিক পরীক্ষার মুহূর্ত হিসেবে। আমরা কি শুধু এক কর্তৃত্বের জায়গায় আরেক কর্তৃত্ব বসাব? আমরা কি শুধু পুরনো শত্রুর বদলে নতুন শত্রু বানাব? আমরা কি আবারও মানুষের জটিলতা, আঘাত, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, বিশ্বাস, ক্ষোভ ও আশা—সবকিছুকে কোনো সহজ ক্যাটাগরিতে ঢুকিয়ে ফেলব? নাকি এবার আমরা এমন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজব, যেখানে truth-telling, mercy, justice, repair, dignity, accountability—সব একসঙ্গে ভাবা যায়? রবুবিয়তের রাজনীতি এখানে একটি কঠিন প্রস্তাব রাখে। এটি বলে: ক্ষমতা যদি আমানত হয়, তাহলে ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জ্ঞান যদি আমানত হয়, তাহলে জ্ঞানকে বিনয়ী হতে হবে। আন্দোলন যদি আমানত হয়, তাহলে আন্দোলনকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ধর্ম যদি আমানত হয়, তাহলে ধর্মকে পালনের নৈতিকতা শেখাতে হবে, শুধু নিয়ন্ত্রণের ভাষা নয়। স্বাধীনতা যদি আমানত হয়, তাহলে স্বাধীনতা শুধু নিজের ইচ্ছা না; অন্যের মর্যাদার দায়ও।
এখানেই ইহসানের সঙ্গে রবুবিয়তের সম্পর্ক আবার ফিরে আসে। ইহসান হলো পালনের মানবিক অনুশীলন—যেখানে মানুষ ন্যূনতম কর্তব্যের বাইরে গিয়ে জীবনকে সুন্দর হতে সাহায্য করে। রাজনীতিতে ইহসান মানে দুর্বলকে ব্যবহার না করা, সত্যকে দলীয় সুবিধার জন্য বিকৃত না করা, ভিন্নমতকে শত্রু না বানানো, উন্নয়নকে শুধু growth না ভাবা, এবং মানুষকে শুধু category হিসেবে না দেখা। ইহসান রাজনীতিকে নরম করে না; বরং গভীর করে। কারণ যে রাজনীতি দয়া জানে না, সে শেষ পর্যন্ত ন্যায়ও জানে না। তাই রবুবিয়ত বামকে বলতে পারে: তোমার ন্যায়ের ভাষা দরকার, কিন্তু দয়া ছাড়া ন্যায় শাস্তিতে পরিণত হয়। ডানকে বলতে পারে: তোমার শৃঙ্খলার ভাষা দরকার, কিন্তু মর্যাদা ছাড়া শৃঙ্খলা জুলুমে পরিণত হয়। লিবারেল রাজনীতিকে বলতে পারে: স্বাধীনতা দরকার, কিন্তু শুধু individual choice যথেষ্ট নয়। উন্নয়নকে বলতে পারে: অবকাঠামো দরকার, কিন্তু জীবনের ভাঙা সম্পর্ক না সারালে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। ধর্মীয় রাজনীতিকে বলতে পারে: নৈতিকতা দরকার, কিন্তু পালন ছাড়া নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। বিপ্লবী রাজনীতিকে বলতে পারে: বদল দরকার, কিন্তু মেরামত ছাড়া বদল ধ্বংসে পরিণত হয়। এইভাবে রবুবিয়ত বাম বা ডানের বিপরীতে আরেকটি দলীয় অবস্থান নয়। এটি একটি বিচারকাঠামো। এটি সব রাজনৈতিক ভাষাকে পরীক্ষা করে: কী পালন করছ? কী ক্ষতিগ্রস্ত করছ? কাকে মর্যাদা দিচ্ছ? কাকে অদৃশ্য করছ? কার কণ্ঠ নিরাপদ করছ? কার কণ্ঠ বিপজ্জনক বানাচ্ছ? কোন জীবনকে flourishing-এর সুযোগ দিচ্ছ? কোন জীবনকে শুধু survival-এ আটকে রাখছ?
এই প্রশ্নগুলো বাংলাদেশের এই সময়ের জন্য খুব জরুরি। কারণ শাসন বদলালেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না। পতন ঘটলেই পালন শুরু হয় না। নতুন ভাষা এলেই নতুন নৈতিকতা আসে না। পোস্ট-জুলাই বাস্তবতার আসল পরীক্ষা হবে—আমরা কি শুধু ক্ষমতার বিন্যাস বদলাব, নাকি রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিও বদলাব? আমরা কি শুধু অন্য পক্ষকে হারাতে চাই, নাকি এমন সমাজ চাই যেখানে সত্য বলা যায়, মর্যাদা রক্ষা পায়, দুর্বল মানুষ নিরাপদ থাকে, এবং ক্ষমতা আমানত হিসেবে বোঝা হয়? সুতরাং রবুবিয়ত রাজনীতিকে পাল্টে দেয়। রাজনীতি আর শুধু এই প্রশ্নে আটকে থাকে না—কে ক্ষমতায় যাবে, কোন মতাদর্শ জিতবে, কোন দল সঠিক। রাজনীতি হয়ে ওঠে আমানতের হিসাব: আমাদের হাতে যে মানুষ, মাটি, পানি, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান, স্মৃতি, শহর, গ্রাম, ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া হয়েছে, আমরা কি তা পালন করছি? শেষ পর্যন্ত বাম না ডান—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: আমাদের রাজনীতি কি সৃষ্টিকে পালনযোগ্য করে তুলছে?
মতামত জানান
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত জানান। মতামত প্রকাশের আগে আমাদের নীতিমালা পড়ে নিন।