রবুবিয়ত নিয়ে আলাপ -৫
রবুবিয়ত নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বারবার একটি প্রশ্ন সামনে আসে: এটি কি শুধু একটি ইসলামি বা ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা? নাকি এর ভেতরে এমন এক ভাষা আছে, যা দিয়ে আজকের পৃথিবীর গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নৈতিক সংকটগুলোকে নতুনভাবে বোঝা যায়? আমার মনে হয়, রবুবিয়তকে শুধু “প্রভুত্ব” বা “শাসন” ....
রবুবিয়ত নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে বারবার একটি প্রশ্ন সামনে আসে: এটি কি শুধু একটি ইসলামি বা ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা? নাকি এর ভেতরে এমন এক ভাষা আছে, যা দিয়ে আজকের পৃথিবীর গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নৈতিক সংকটগুলোকে নতুনভাবে বোঝা যায়? আমার মনে হয়, রবুবিয়তকে শুধু “প্রভুত্ব” বা “শাসন” হিসেবে অনুবাদ করলে এর গভীরতা হারিয়ে যায়। প্রভুত্ব বললেই আমাদের কল্পনায় আসে ক্ষমতা, মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশ, আইন, আনুগত্য। কিন্তু রবুবিয়ত এর চেয়ে অনেক গভীর এবং কোমল ধারণা। রবুবিয়ত মানে পালন। ধারণ। রিজিকদান। মেরামত। সংশোধনের সুযোগ। ভঙ্গুর জীবনকে ধীরে ধীরে তার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে দেওয়া। এমন এক সম্পর্ক, যার ভেতরে জীবন শুধু অস্তিত্ব লাভ করে না; জীবনকে বহন করা হয়, পুষ্ট করা হয়, ফিরিয়ে আনা হয়, আবার শুরু করার সুযোগ দেওয়া হয়। এই জায়গা থেকেই রবুবিয়ত শুধু ধর্মীয় শব্দ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। এমন এক ভাষা, যা পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিবাদের ভাষা থেকে আলাদা। পুঁজিবাদ আমাদের শিখিয়েছে পৃথিবী হলো সম্পদ। জমি সম্পদ, নদী সম্পদ, শ্রম সম্পদ, নারী সম্পদ, গরিব মানুষ সম্পদ, এমনকি কল্পনাশক্তিও সম্পদ। সবকিছুর বাজারমূল্য থাকতে পারে, কিন্তু সবকিছুর মর্যাদা থাকে না। সবকিছু ব্যবহারযোগ্য, কিন্তু সবকিছু পালনযোগ্য নয়। পুঁজিবাদের চোখে জীবনকে টিকিয়ে রাখা নয়, জীবন থেকে মূল্য আহরণ করাই প্রধান কাজ। জাতীয়তাবাদ আমাদের শিখিয়েছে যত্নেরও সীমানা আছে। দেশ আছে, পতাকা আছে, নাগরিক আছে, অ-নাগরিক আছে, ভেতরের মানুষ আছে, বাইরের মানুষ আছে। মানুষকে ভালোবাসা যাবে, কিন্তু আগে তাকে জাতীয় পরিচয়ের ভেতরে বসাতে হবে। নদী যদি সীমান্ত পেরিয়ে যায়, তাকে সন্দেহ করতে হবে। মানুষ যদি সীমান্ত পেরিয়ে আসে, তাকে হুমকি ভাবতে হবে। জাতীয়তাবাদ যত্নকে সার্বজনীন হতে দেয় না; যত্নকে সার্বভৌম সীমানার ভেতরে বন্দি করে।
ব্যক্তিবাদ আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ নিজেই নিজের প্রকল্প। নিজের সাফল্য, নিজের উন্নতি, নিজের পেশা, নিজের সুখ, নিজের চিকিৎসা, নিজের ব্র্যান্ড, নিজের স্বাধীনতা। যেন মানুষ কখনো কারও দ্বারা পালিত হয়নি। যেন মানুষ মায়ের দুধ খায়নি, প্রতিবেশীর সাহায্য নেয়নি, মাটির ওপর হাঁটেনি, বাতাসের ওপর নির্ভর করেনি, ভাষা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়নি। ব্যক্তিবাদ মানুষের সম্পর্ক মুছে দিয়ে মানুষকে অর্জনের যন্ত্রে পরিণত করে। রবুবিয়ত এই তিনটির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। পুঁজিবাদের আহরণের বিরুদ্ধে এটি বলে: জীবনকে ব্যবহার করো না, পালন করো। জাতীয়তাবাদের সীমানার বিরুদ্ধে এটি বলে: যত্নের জগৎ মানুষের বানানো সীমান্তের চেয়ে বড়। ব্যক্তিবাদের অহংকারের বিরুদ্ধে এটি বলে: তুমি নিজে নিজে হওনি; তোমাকে ধরা হয়েছে, খাওয়ানো হয়েছে, শেখানো হয়েছে, ক্ষমা করা হয়েছে, বহন করা হয়েছে। এই জায়গায় এসে দেখা যায়, রবুবিয়ত একা নয়। পৃথিবীর নানা সংস্কৃতি, নানা আধ্যাত্মিকতা, নানা আদিবাসী, ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী, নারীবাদী, পরিবেশবাদী এবং লোকজ ধারায় এর কাছাকাছি অনেক ধারণা আছে। এগুলো একই নয়। এগুলোকে জোর করে এক করা যাবে না। কিন্তু এদের মধ্যে আত্মীয়তা আছে। যেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ বিভিন্ন ভাষায় একই গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে: জীবনকে কেবল শাসন করলে হয় না; জীবনকে পালন করতে হয়। আন্দীয় আদিবাসী চিন্তায় আছে Buen Vivir বা Sumak Kawsay। এর অর্থ শুধু “ভালো জীবন” নয়। ভালো জীবন মানে বেশি আয়, বড় বাড়ি, ব্যক্তিগত সুখ বা বাজারে সাফল্য নয়। ভালো জীবন মানে মানুষ, জমি, নদী, প্রাণী, পূর্বপুরুষ, সমাজ এবং মহাজগতের সঙ্গে সঠিক সম্পর্কে থাকা। এখানে উন্নয়ন মানে প্রকল্প নয়; উন্নয়ন মানে সম্পর্ক মেরামত। জীবনকে এমনভাবে সাজানো, যাতে মানুষ একা বড় না হয়, বরং সবাই মিলে ভালো থাকে। রবুবিয়তের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে, কারণ দুটোই জীবনকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চোখে দেখে না; জীবনকে দেখে পালনযোগ্য, সম্পর্কময় এবং নৈতিকভাবে জড়িত বাস্তবতা হিসেবে। বলিভিয়ার আয়মারা ধারার Suma Qamaña বা Vivir Bien-ও একই পরিবারের ধারণা। এখানে ভালোভাবে বাঁচা মানে অন্যের চেয়ে ভালোভাবে বাঁচা নয়। অন্যকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার নাম ভালো জীবন নয়। ভালো জীবন মানে ভারসাম্য, পারস্পরিকতা, যথেষ্টতা। এই যথেষ্টতার ভাষা পুঁজিবাদ পছন্দ করে না। কারণ পুঁজিবাদ চায় আকাঙ্ক্ষা যেন কখনো শেষ না হয়। মানুষ যেন সবসময় আরও চায়, আরও কেনে, আরও জমায়, আরও প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু Suma Qamaña বলে: জীবনকে ভালো করতে হলে আকাঙ্ক্ষাকে অসীম করতে হবে না; সম্পর্ককে সঠিক করতে হবে। আফ্রিকান ধারায় আছে Ubuntu—আমি আছি কারণ আমরা আছি। এটি শুধু একটি সুন্দর বাক্য নয়। এটি ব্যক্তিবাদের পুরো ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়। মানুষ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নয়। মানুষ সম্পর্কের ভেতরে মানুষ। আমি আমার মা-বাবা, প্রতিবেশী, শিক্ষক, বন্ধু, মৃতজন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, ভাষা, মাটি—সবকিছুর দ্বারা গঠিত। Ubuntu-এর ভেতরে ইহসানের শক্তিশালী সুর আছে। কারণ ইহসান মানে শুধু নিজের ব্যক্তিগত নৈতিক উৎকর্ষ নয়; ইহসান মানে অন্যের মর্যাদা রক্ষা করে সুন্দরভাবে আচরণ করা। মানুষকে এমনভাবে দেখা, যাতে সে মানুষ হতে পারে। মাওরি ধারায় আছে Kaitiakitanga। সাধারণভাবে একে অভিভাবকত্ব বা তত্ত্বাবধান বলা হয়, কিন্তু এটাও যথেষ্ট নয়। Kaitiakitanga মানে জমি, পানি, পূর্বপুরুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রক্ষকসুলভ দায়িত্ব। মানুষ জমির মালিক নয়; মানুষ জমির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ প্রকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; মানুষ প্রকৃতির ভেতরে, ইতিহাসের ভেতরে, ঋণের ভেতরে। রবুবিয়তের ভাষায় বললে, মানুষ চূড়ান্ত রব নয়; মানুষ আমানত বহনকারী। তার হাতে যে পৃথিবী আছে, তা মালিকানার পৃথিবী নয়; তা অর্পিত পৃথিবী। মাওরি ধারণা Manaakitanga আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। এর মধ্যে আছে আতিথ্য, উদারতা, যত্ন এবং অন্যের মর্যাদা তুলে ধরা। কাউকে খাওয়ানো, জায়গা দেওয়া, সম্মান দেওয়া, তার ক্লান্তি বুঝে নেওয়া, তার মর্যাদা রক্ষা করা—এসব ছোট কাজ নয়। এগুলো ইহসানের দৈনন্দিন রূপ। ইহসান শুধু বিশাল নৈতিক ঘোষণা নয়; ইহসান এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়া, কাউকে অপমান না করা, ক্ষমতার জায়গা থেকে নরম থাকা, নিজের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অন্যকে জায়গা করে দেওয়া। নেটিভ হাওয়াইয়ান ধারণা Aloha ʻĀina—ভূমির প্রতি ভালোবাসা—রবুবিয়তের পরিবেশগত ভাষা খুলে দেয়। ভূমি এখানে সম্পত্তি নয়। ভূমি হলো খাদ্যদায়ী সম্পর্ক। জমি মানুষকে খাওয়ায়, মানুষ জমিকে রক্ষা করে। এই পারস্পরিকতা আধুনিক সম্পত্তি-ব্যবস্থা বুঝতে পারে না। আধুনিক রাষ্ট্র জমিকে খতিয়ান বানায়, পুঁজিবাদ জমিকে সম্পদ বানায়, উন্নয়ন জমিকে প্রকল্পের জায়গা বানায়। Aloha ʻĀina বলে: ভূমি সম্পর্ক। এই কথাটি রবুবিয়তের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কারণ রবুবিয়তও বলে, জীবনকে জড় বস্তু হিসেবে দেখা যাবে না। জীবন আগে থেকেই ধারণ করা, পুষ্ট করা, বহন করা বাস্তবতা।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ধারায় আছে Caring for Country। এখানে Country মানে শুধু দেশ বা ভৌগোলিক এলাকা নয়। Country জীবন্ত, পূর্বপুরুষবাহী, কাহিনিবাহী, নিয়মবাহী, সম্পর্কময়। Country মানুষকে ধারণ করে, শেখায়, স্মৃতি বহন করে। Caring for Country মানে শুধু সংরক্ষণ নয়; এটি সম্পর্ক রক্ষা। এই ধারণা আমাদের শেখায়, পরিবেশ কোনো বাইরের খাত নয়। পরিবেশ হলো আত্মীয়তা, দায়, স্মৃতি, জীবনচক্র। রবুবিয়তও তাই বলে: জীবনকে পালন করার জন্য শুধু নীতি যথেষ্ট নয়; সম্পর্ক ঠিক করতে হবে। লাকোটা ধারার Mitákuye Oyás’iŋ—সবই আমার সম্পর্ক—এই আলাপকে আরও প্রসারিত করে। মানুষ, প্রাণী, পাখি, গাছ, পানি, পাথর, আকাশ—সবকিছু সম্পর্কের ভেতরে। এখানে যত্ন শুধু মানুষকেন্দ্রিক নয়। এই ধারণা আমাদের আধুনিক মানবকেন্দ্রিক নৈতিকতার বাইরে নিয়ে যায়। রবুবিয়তের এক মহাজাগতিক দিক এখানেও দেখা যায়: জীবন শুধু মানুষের জীবন নয়; বহু জগত আছে, বহু সত্তা আছে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পর্ক আছে। বৌদ্ধ ধারায় আছে Karuṇā এবং Mettā। Karuṇā মানে করুণা—অন্যের কষ্ট কমানোর আকাঙ্ক্ষা। Mettā মানে মৈত্রী—সব জীবের প্রতি মঙ্গলকামনা। এগুলো ইহসানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। কারণ ইহসান হলো সৌন্দর্যসহ কাজ করা, দয়া নিয়ে কাজ করা, মনোযোগ দিয়ে কাজ করা। শুধু নিয়ম মেনে চলা নয়; এমনভাবে কাজ করা যাতে অন্যের কষ্ট কমে, অন্যের মর্যাদা বাড়ে, পৃথিবীতে কোমলতা তৈরি হয়। স্বাহিলি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আছে Harambee—সবাই মিলে টানা, একসঙ্গে কাজ করা। তানজানিয়ার Ujamaa আছে—পরিবারত্ব, সমবায়ী জীবন। ইন্দোনেশীয় Gotong Royong আছে—সামাজিক শ্রম, পারস্পরিক সাহায্য। ফিলিপিনো Bayanihan আছে—সমাজ একসঙ্গে সমাজকে বহন করে। এগুলো সব দৈনন্দিন রবুবিয়তের ভাষা। মানুষ একে অন্যকে ধরে। ঘর তোলে। নৌকা ঠেলে। খাবার রান্না করে। বন্যার পর ঘর মেরামত করে। মৃতের পরিবারকে সাহায্য করে। এগুলো কল্যাণরাষ্ট্রের আগের, বাজারভিত্তিক বীমার আগের, এনজিও প্রকল্পের আগের যত্নের অবকাঠামো। ফিলিপিনো ধারণা Kapwa বলে, সত্তা ভাগাভাগি করা। আমি আর তুমি সম্পূর্ণ আলাদা নই। আমাদের অস্তিত্ব একে অন্যের মধ্যে জড়িত। এই কথাটি ব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী। পুঁজিবাদ চায় আত্মকেন্দ্রিক ভোক্তা। জাতীয়তাবাদ চায় অনুগত নাগরিক। আমলাতন্ত্র চায় চিহ্নিত সুবিধাভোগী। কিন্তু Kapwa, Ubuntu, সমাজ—সবই বলে: মানুষকে সম্পর্ক ছাড়া বোঝা যায় না। লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী চিন্তায় আছে Pluriverse—এমন এক পৃথিবী যেখানে বহু পৃথিবী জায়গা পায়। রবুবিয়তের বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা বোঝার জন্য এই ধারণা খুব জরুরি। কারণ রবুবিয়ত কোনো একরৈখিক সাম্রাজ্যিক ভাষা নয়। এটি এমন এক পালনব্যবস্থার কথা বলে, যা জীবনের বহু রূপকে ধ্বংস না করে তাদের সম্ভাবনা দেয়। আধুনিক উন্নয়ন অনেক সময় একটাই পৃথিবী বানাতে চেয়েছে: একই রাস্তা, একই স্কুল মডেল, একই শাসন কাঠামো, একই সূচক, একই জিডিপি যুক্তি, একই অগ্রগতির গল্প। Pluriverse বলে, না, বহু জগত আছে, এবং তাদের বাঁচতে দিতে হবে। রবুবিয়ত এই বহু-জগতের রাজনীতিকে ধর্মতাত্ত্বিক ও নৈতিক গভীরতা দিতে পারে: যে পালন করে, সে সবকিছুকে একরকম বানায় না; সে জীবনকে তার নিজস্ব সম্ভাবনায় যেতে দেয়। জাপাতিস্তা ধারণা mandar obedeciendo—আজ্ঞা মানতে মানতে নেতৃত্ব দেওয়া—রবুবিয়তের রাজনৈতিক ভাষার খুব কাছে। নেতৃত্ব মানে নির্দেশ দেওয়া নয়; নেতৃত্ব মানে শোনা। যে নেতৃত্ব সমাজের কথা শুনতে পারে না, সে nurturing নেতৃত্ব নয়। সে আধিপত্য। রবুবিয়তকে যদি শাসনের ভাষায় ভাবি, তবে তা হবে এমন ক্ষমতা, যা শোনে; এমন ক্ষমতা, যা সেবা করে; এমন ক্ষমতা, যা অপমান করে না। নারীবাদী যত্ন-নৈতিকতা আমাদের আরেকটি জরুরি ভাষা দেয়। আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা দীর্ঘদিন ধরে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু নারীবাদী যত্ন-নৈতিকতা বলেছে: নির্ভরতা ব্যতিক্রম নয়; নির্ভরতাই জীবনের শর্ত। আমরা সবাই নির্ভরশীল। শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী, গরিব, অভিবাসী, শোকাহত, ক্লান্ত—সবাই যত্নের জালে বাঁচে। আসলে শক্তিশালী মানুষও যত্ন ছাড়া বাঁচে না; শুধু তাদের যত্ন অদৃশ্য করা থাকে। রবুবিয়ত এই অদৃশ্য যত্নকে অস্তিত্বগত মর্যাদা দেয়। জীবন পালিত হয়—এটাই বাস্তবতা। Commons এবং mutual aid একই কথা রাজনৈতিকভাবে বলে। Commons মানে শুধু যৌথ সম্পত্তি নয়। Commons মানে যৌথ জীবন, যৌথ দায়িত্ব, যৌথ শাসন, যৌথ মেরামত। Mutual aid মানে দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক নয়; মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায় কারণ জীবন ভাগাভাগি করা। এই জায়গায় ইহসান দান থেকে আলাদা। দান অনেক সময় hierarchy ধরে রাখে। ইহসান hierarchy ভাঙে। ইহসান শুধু দেয় না; সম্পর্ক বদলায়। ইভান ইলিচের conviviality ধারণাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। Convivial প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্র হলো সেগুলো, যা মানুষকে নিজের জীবন, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা ও সমাজ ধরে রাখতে সাহায্য করে; মানুষকে ব্যবস্থার দাস বানায় না। রবুবিয়তের রাজনৈতিক অনুবাদ করতে গেলে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে: আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি convivial? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়? রাষ্ট্র? এনজিও? উন্নয়ন প্রকল্প? মসজিদ? স্কুল? এগুলো কি জীবনকে পোষণ করে, নাকি জীবন থেকে শুধু আনুগত্য ও হিসাব আহরণ করে? আর আমাদের নিজের বাংলায়? আছে পালন। এই শব্দটি অসাধারণ। শিশুকে পালন করা, গরু পালন করা, সম্পর্ক পালন করা, দায়িত্ব পালন করা, প্রতিশ্রুতি পালন করা। পালন মানে শুধু শাসন নয়। পালন মানে যত্ন, ধারাবাহিকতা, দায়িত্ব, ধৈর্য। রবুবিয়ত বাংলায় আনতে গেলে “শাসন” নয়, “পালন” শব্দটি অনেক বেশি গভীর। কারণ শাসন নিয়ন্ত্রণ করে, পালন সম্ভাবনা তৈরি করে।
আছে সমাজ। সমাজ শুধু population নয়, civil society নয়, stakeholder group নয়। সমাজ হলো জীবন্ত সম্পর্কের বিন্যাস। সেখানে দায় আছে, লজ্জা আছে, সুনাম আছে, সাহায্য আছে, নিপীড়নও আছে, যত্নও আছে। সমাজ নিখুঁত নয়। কিন্তু সমাজ ছাড়া মানুষ কেবল প্রশাসনিক সত্তা হয়ে যায়। রবুবিয়তের আলোচনায় সমাজ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক যত্ন রাষ্ট্র দেয় না, বাজার দেয় না; সমাজের অনানুষ্ঠানিক বিন্যাস দেয়। আছে আড্ডা, আছে মজলিস। বসা আছে। শোনা আছে। খাবার আছে। বিতর্ক আছে। কথা ঘুরে বেড়ানো আছে। উৎপাদনশীলতার চোখে এগুলো সময় নষ্ট। কিন্তু সম্পর্কের চোখে এগুলো জীবনের অবকাঠামো। যে সমাজ বসতে পারে না, সে সমাজ শুনতে পারে না। যে সমাজ শুনতে পারে না, সে সমাজ পালন করতে পারে না। আছে ইনসানিয়ত। শুধু মানবতা নয়; মানুষের ভেতরের মানুষের ভাব। কারও মধ্যে এখনো কোমলতা আছে কি না। সে ক্ষমতা পেলে কেমন আচরণ করে? সে দুর্বল মানুষকে কেমন দেখে? দরজায় আসা মানুষকে কীভাবে বসায়? শ্রমিককে কীভাবে ডাকে? গরিবের সঙ্গে কথা বললে তার গলায় কেমন স্বর আসে? ইনসানিয়ত হলো দৈনন্দিন ইহসানের ভাষা। এই সব শব্দের মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র আছে। এগুলো পুঁজিবাদের শব্দ নয়। এগুলো জাতীয়তাবাদী গৌরবের শব্দ নয়। এগুলো ব্যক্তিগত সাফল্যের শব্দ নয়। এগুলো অন্য ধরনের সভ্যতার শব্দ। এগুলো বলে: জীবন মালিকানাধীন নয়, অর্পিত। জমি সম্পদ নয়, সম্পর্ক। মানুষ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নয়, সম্পর্কময় সত্তা। উন্নয়ন আহরণ নয়, বিকাশ ও পুষ্টি। শাসন নিয়ন্ত্রণ নয়, পালন। যত্ন দুর্বলতা নয়, জগত নির্মাণের শক্তি। মেরামত প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, নৈতিক-রাজনৈতিক কাজ। জ্ঞান তথ্য নয়, দায়িত্ব। নেতৃত্ব নির্দেশ নয়, শ্রবণ। স্বাধীনতা বিচ্ছিন্নতা নয়, সঠিক সম্পর্ক। এগুলোই সেই ধারণা, যা পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিবাদ আমাদের ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। কারণ এই ধারণাগুলো মনে থাকলে মানুষকে সহজে ভোক্তা বানানো যায় না। মানুষকে শুধু নাগরিক বানানো যায় না। মানুষকে শুধু শ্রমিক বানানো যায় না। মানুষকে শুধু সুবিধাভোগী বানানো যায় না। মানুষ তখন নিজের চারপাশের জগতকে দেখতে শুরু করে: কে আমাকে ধরে রেখেছে? আমি কাকে ধরে রেখেছি? কোন সম্পর্ক ভেঙে গেছে? কোন জীবন পরিত্যক্ত? কোন নদী অপমানিত? কোন শ্রম অদৃশ্য? কোন যত্ন বিনা মজুরিতে চলছে? কোন আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখা হয়েছে? কোন জগতকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি? রবুবিয়ত তাই শুধু একটি ইসলামি ধারণাকে সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা দেওয়ার চেষ্টা নয়। বরং এটি এক বৃহত্তর পুনরুদ্ধারের কাজ। এমন সব শব্দ, স্মৃতি, চর্চা, জগতদৃষ্টি ও নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা—যেগুলো আধুনিকতার প্রধান ভাষা প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। এই পুনরুদ্ধার অতীতমুখী নয়। আমরা অতীতে ফিরতে চাই না। আমরা এমন ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে জীবন আবার কেন্দ্রে আসে। এখানে ইহসান আসে মানবিক চর্চা হিসেবে। রবুবিয়ত হলো জীবনধারণকারী ব্যবস্থা; ইহসান হলো সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সুর মিলিয়ে কাজ করার মানবিক সাধনা। রবুবিয়ত বলে, জীবন পালিত হয়। ইহসান বলে, তাহলে তুমিও সুন্দরভাবে পালন করো। শুধু ন্যায় করো না, সৌন্দর্য দিয়ে করো। শুধু দায়িত্ব পালন করো না, দয়া দিয়ে করো। শুধু মেরামত করো না, অপমান ছাড়া করো। শুধু পরামর্শ করো না, সত্যি শুনো। শুধু দান করো না, সম্পর্ক বদলাও। শুধু উন্নয়ন করো না, জীবনজগতগুলোকে বিকশিত হতে দাও। এই কারণেই রবুবিয়ত বৈশ্বিক। কারণ এটি Buen Vivir, Ubuntu, Kaitiakitanga, Aloha ʻĀina, Caring for Country, Seva, Karuṇā, Tikkun Olam, Gotong Royong, Bayanihan, Commons, Care Ethics বা Pluriverse-কে প্রতিস্থাপন করে না। বরং এদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। এটি কোনো নতুন সাম্রাজ্যিক শব্দভান্ডার নয়। এটি একটি আমন্ত্রণ: পৃথিবীর নানা ভাষায় ছড়িয়ে থাকা জীবনধারণকারী ধারণাগুলোকে একে অন্যের পাশে বসিয়ে দেখা। কোথায় তারা মেলে? কোথায় আলাদা? কী শেখায়? কী সতর্ক করে? কীভাবে তারা আমাদের উন্নয়ন, শাসন, প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতার মৃত ভাষা থেকে বের করে?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ। আমরা কি এমন পৃথিবী চাই, যেখানে সবকিছু মাপা যায়, কিন্তু কিছুই পালন করা হয় না? আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই, যা নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু পুষ্ট করে না? আমরা কি এমন অর্থনীতি চাই, যা বড় হয়, কিন্তু জীবন ধ্বংস করে? আমরা কি এমন ব্যক্তি হতে চাই, যে সফল, কিন্তু সম্পর্কের দিক থেকে নিঃস্ব? রবুবিয়ত আমাদের এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড় করায়। আর ইহসান বলে: শুধু প্রশ্ন করলেই হবে না, এখন সুন্দরভাবে কাজ করো। বহু জগতের মানুষ এই কথা আগে থেকেই জানত। তাদের কাছে এর শব্দ ছিল। চর্চা ছিল। গান ছিল। আচার ছিল। আতিথ্য ছিল। পরিবেশগত সম্পর্ক ছিল। সামষ্টিক শ্রম ছিল। মেরামতের ঐতিহ্য ছিল। আমরা ভুলে গেছি, কারণ আধুনিক পৃথিবী আমাদের বলেছে এগুলো পশ্চাৎপদ, স্থানীয়, নরম, অবৈজ্ঞানিক, অদক্ষ, অনুৎপাদনশীল। কিন্তু হয়তো এগুলো কখনোই পশ্চাৎপদ ছিল না। হয়তো এগুলোই ছিল সেই ধারণা, যা পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিবাদ আমাদের মনে রাখতে দিতে চায়নি। কারণ এগুলো মনে পড়লে আরেক ধরনের পৃথিবী কল্পনা করা যায়। যে পৃথিবী আহরণের ওপর দাঁড়ায় না, দাঁড়ায় পালনের ওপর। আধিপত্যের ওপর না, আমানতের ওপর। প্রতিযোগিতার ওপর না, বরকতের ওপর। পরিত্যাগের ওপর না, রহমতের ওপর। একাকী সাফল্যের ওপর না, যৌথ বিকাশের ওপর। হয়তো মেরামতের আকাঙ্ক্ষা এখান থেকেই শুরু হয়: শুধু ভাঙা জিনিস ঠিক করার মধ্যে নয়, বরং সেই শব্দগুলো ফিরে পাওয়ার মধ্যে, যেগুলো দিয়ে অন্য এক পৃথিবী আবার কামনা করা যায়। মোদ্দা কথা: আমাদের এমন এক ভাষা দরকার, যা একদিকে আমাদের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী অতীতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে ভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে দরজা খোলে। কারণ কল্পনা মানে শুধু নতুনের জন্য নতুন কিছু বানানো নয়। অনেক সময় কল্পনার কাজ হলো অতীত থেকে এমন কিছু ফিরিয়ে আনা, যা কোনো nostalgic প্রত্যাবর্তন নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপকরণ। আমাদের ইতিহাসে, আমাদের লোকজ জীবনচর্চায়, ইসলামি নৈতিক ভাষায়, সমাজের অদৃশ্য যত্নের ভেতরে এমন অনেক ধারণা আছে, যেগুলোকে colonial modernity পশ্চাৎপদ, irrational বা private matter বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ যখন পুঁজিবাদী আহরণ, ভোগবাদী সংস্কৃতি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিঃসঙ্গতা, ঔপনিবেশিক আধুনিকতা এবং নতুন ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে ভাবছে, তখন আমাদেরও সেই বৈশ্বিক আলাপে আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। আমরা একা জাতি হিসেবে এই কাজ করতে পারব না। আমাদের এমন এক সিলসিলা দরকার, যা আমাদের নিজেদের মাটি থেকে উঠে আসে, কিন্তু আমাদেরকে Buen Vivir, Ubuntu, Kaitiakitanga, Caring for Country, Seva, Tikkun Olam, mutual aid, commons এবং care ethics-এর মতো মুক্তির অন্য যাত্রার মানুষের সঙ্গে আত্মীয় করে। রবুবিয়ত এমন এক সম্ভাব্য সেতু—নিজের ঘর থেকে শুরু করে বহু জগতের সঙ্গে কথা বলার ভাষা।
তবে রবুবিয়তকে ফিরিয়ে আনা মানে কোনো পুরনো পিতৃতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী বা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী ভাষা পুনরুৎপাদন করা নয়। বরং বর্তমান পাঠের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো রবুবিয়তকে জুলুমের সব প্রবণতা থেকে মুক্ত করে পুনরায় কল্পনা করা। কারণ মানুষ হওয়া মানেই reflexive হওয়া—নিজের অবস্থান, নিজের ক্ষমতা, নিজের ভাষা, নিজের ভুল, নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তা করতে পারা। এই আত্মসমালোচনামূলক অবস্থানই রবুবিয়তকে শাসন, আধিপত্য, পুরুষতন্ত্র বা নৈতিক পুলিশিংয়ের দিকে সরে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। রবুবিয়ত যদি পালন, রহমত, আমানত, ইনসানিয়ত, শোনা, সংশোধন ও জীবনধারণের ভাষা হয়, তবে তা কোনো এক দলের একচেটিয়া স্লোগান হতে পারে না। বরং আমাদের এমন একটি সর্বনিম্ন সাধারণ নৈতিক ভিত্তি দরকার, যেখানে ভিন্ন মত, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান, ভিন্ন ধর্মীয় বা দার্শনিক পথের মানুষও অন্তত এটুকুতে একমত হতে পারে: জীবনকে ধ্বংস নয়, পালন করতে হবে; ক্ষমতা মানে দমন নয়, আমানত; সমাজ মানে প্রতিযোগিতা নয়, পারস্পরিক ধারণ; উন্নয়ন মানে আহরণ নয়, যৌথ বিকাশ। এই অর্থে রবুবিয়ত আমাদের সময়ের জন্য এক সম্ভাব্য commons-এর ভাষা—যার ভেতর দিয়ে আমরা নিজেদেরও পুনরায় ভাবতে পারি, এবং অন্যদের সঙ্গেও মুক্তির যাত্রায় আত্মীয়তা তৈরি করতে পারি
মতামত জানান
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত জানান। মতামত প্রকাশের আগে আমাদের নীতিমালা পড়ে নিন।